খেলাচ্ছলে নিষ্ঠুরতা শিখছে শিশুরা

বন্দুক-পিস্তলের মতো খেলনা এড়িয়ে চলার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

48

চার বছরের শিশু সাফির বাবার সঙ্গে খেলনা পিস্তল দিয়ে খেলছে। বাবা জানান, সাফিরের পিস্তল খুব পছন্দ। দোকানে গেলেই সে বিভিন্ন ধরনের পিস্তল, বন্দুক, গুলি এসব পছন্দ করে। বাবা রায়হান হোসেন শিশুর এই মারণাস্ত্র দিয়ে খেলাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন না। তিনি বলেন, শিশু যা চায়, তাই কিনে দিই। এখানে খারাপের কী আছে!

ঘটনা দুই :ছেলে রাহুলের প্রতি গোস্সা করেছেন তার মা। বিষয়টা জানতে চাইলে, রাহুল বলে, আমি একটা পা-কাটা মানুষের ছবি এঁকেছি। তাই মা ভয় পেয়েছে, আমার ওপর রাগ করেছে। রাহুলের মা বলেন, আমি এখনো কোনো বিকলাঙ্গ মানুষের দিকে তাকাতে পারি না। আর আমার ছয় বছরের ছেলে কিনা পা-কাটা মানুষের ছবি আঁকছে। মনে মনে এমন বিভত্সতার চিন্তা কোথা থেকে এলো, তাই ভাবছি।

শুধু সাফির কিংবা রাহুল নয়, শিশুরা এখন এমন সব দেশি-বিদেশি ধারালো অস্ত্র ও মারণাস্ত্রের আদলে তৈরি খেলনা দিয়ে খেলছে। এসব খেলনা তাদের নিষ্ঠুর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। ওসব খেলনায় শিশু শিখছে সহিংসতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব খেলনা দিয়ে খেলাচ্ছলেই নিষ্ঠুরতা শিখছে শিশুরা। খেলনা অস্ত্র দিয়ে খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে আসল অস্ত্রের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। অভিভাবকরা এটাকে নিছক খেলনা ভেবে শিশুর হাতে তুলে দিলেও প্রযুক্তির কারণে কোন অস্ত্রের কী ব্যবহার, তা সহজে জেনে যাচ্ছে শিশু।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারালো মারণাস্ত্রের আদলে তৈরি খেলনাসামগ্রী অনেক শিশুর আচরণে পরিবর্তন আনে। এটা করতে দেওয়া উচিত নয়। এতে শিশু সহিংস হয়ে ওঠে। এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও এসব খেলনা ব্যবহার করেই তাদের অভিযান সফল করছে বলে অভিযোগ আছে। খেলনার পাশাপাশি রয়েছে সহিংস কনটেনট-নির্ভর বিভিন্ন ভিডিও গেমস। এসব গেমের প্রভাবে শিশু বিকৃত লাশ বা মাথাকাটা মানুষের ছবি দেখে ভীত হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের খেলনাসামগ্রী আমদানি ও বিক্রির জন্য দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। আর বিধিনিষেধ না থাকায় খেলনা ব্যবসায়ী ও অভিভাবকরা বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে খেলনার দোকানে কিংবা ফুটপাতে শিশুদের নানা ধরনের প্লাস্টিক, মেটাল, কাঠ, বাঁশ দিয়ে তৈরি খেলনা বিক্রি হচ্ছে। ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির খেলনা পিস্তল, রাইফেল, তির-ধনুকও বিক্রি হচ্ছে। পিস্তল ও রাইফেলে ব্যবহারের জন্য প্লাস্টিক দিয়ে বানানো বুলেটও রয়েছে। খেলনা পিস্তল ছাড়াও নানা ধরনের চাকু, তলোয়ার ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। কম বয়সি অনেক শিশুই অভিভাবকের সঙ্গে এসে এসব খেলনা পছন্দ করে কিনে নিচ্ছে। রাজধানীর নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন সুপার শপ, শপিংমলেও এ ধরনের রকমারি খেলনা দোকানেও আরো আধুনিক ও ভয়ংকরদর্শন সব খেলনা আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন অনলাইন শপেও এখন এ ধরনের খেলনাসামগ্রী বিক্রি হচ্ছ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালে অনেক শিশু-কিশোর চার দেওয়ালে বন্দি থেকে ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। আর ভিডিওগেমগুলোর বেশির ভাগই সহিংস। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সহিংস এসব গেম খেলে শিশুদের মনস্তত্ত্বে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মনোবিজ্ঞনী ডা. মোহিত কামাল ইত্তেফাককে বলেন, শিশুদের মন কাদা-মাটির তৈরি। তারা যা দেখে তাই শেখে। তারা শিশু বয়সে যা দেখে তাই তাদের মনে ছাপ ফেলে। বড় হয়েও কথায় কথায় মারধর করে। আমরা যেন শিশুদের ধ্বংসাত্মক জিনিস বা খেলনা দিয়ে খেলতে না দিই।

Leave A Reply

Your email address will not be published.